কিভাবে নামাজের মাধূর্য আস্বাদন করা যায়? পর্ব ২০

Uncategorized

আগের পর্বগুলোতে সুরা ফাতিহার আলোচনায় জেনেছি, কিভাবে বিশেষতঃ এই সুরাটির মাধ্যমে আমরা আল্লাহর সাথে কথোপকথন করতে পারি, এবং আল্লাহ প্রতিটি আয়াতের সাথে সাথে কিভাবে জবাব দেন। এই সুরা আল্লাহর রুবুবিয়াতের (আল্লাহই সমস্ত সৃষ্টি জগতসমূহের রব) ঘোষণা দেয়, সাথে সাথে এটাও বর্ণনা করে যে আল্লাহর রুবুবিয়াতে রয়েছে তাঁর রহমত ও করুনার প্রাধান্য, যে কারনে সৃষ্টি জগতসমূহের রবের প্রশংসার পর পরই আমরা বলি –‘আর রহমানির রহীম’। কিয়ামত দিবসের মালিকত্বের বর্ণনার আগেই আমরা জানতে পারি যে তাঁর করুনা তাঁর ক্রোধের চেয়ে বেশী। অতঃপর আমরা জানতে পারি কেন আমাদেরকে এই করুনা করা হয় – যাতে আমরা শুধুমাত্র তাঁরই ইবাদত করি। এবং তাঁর ইবাদত করতেও আমরা তাঁর কাছেই সাহায্য চাই। একারনে আমরা বলি –“শুধুমাত্র তোমারই ইবাদত করি এবং তোমার কাছেই সাহায্য প্রার্থনা করি”

কাজেই আমরা যদি সাহায্য পেতে চাই, আমাদেরকে সাহায্য প্রার্থনা করতে হবে।

পথপ্রদর্শন

এখন আমরা প্রকৃতপক্ষে দোয়া শুরু করছি। “আমাদেরকে সরল সঠিক পথ প্রদর্শন করুন। তাদের পথ যাদের প্রতি আপনি অনুগ্রহ করেছেন; তাদের নয় যাদের প্রতি আপনার গজব বর্ষিত হয়েছে এবং তাদেরও নয় যারা পথভ্রষ্ট।” [সুরা ফাতিহা:৬-৭]

ইবনে তাইমিয়্যা বলেন, সুরা ফাতিহার এই দোয়াটিই হল সর্বশ্রেষ্ঠ, বিজ্ঞতম, এবং সবচেয়ে উপকারী দোয়া। আল্লাহ যদি আমাদের সরলতম পথ প্রদর্শন করেন, তিনি আমাদের তাঁর ইবাদত করতেও সাহায্য করেন।

কেউ প্রশ্ন করতে পারে, ‘আমি যদি সঠিক পথেই থাকি তবে আবার কেন পথপ্রদর্শনের জন্য প্রার্থনা করব? আমি নামাজ পড়ি, রোজা রাখি, কুরআন তেলাওয়াত করি- আল্লাহ তো নিশ্চয়ই আমাকে হেদায়াত করেছেনই।’ প্রথমত, হেদায়াতের সর্বোচ্চ পর্যায় হল মহানবী (সাঃ) এর সমান পর্যায়ে পৌছতে পারা, অথচ আমরা কেউই এমনকি সাহাবীদের পর্যায় পর্যন্ত পৌছতে সক্ষম হয়েছি বলেও দাবী করতে পারি না। একারনেই আমরা প্রার্থনা করি যাতে আল্লাহ আমাদের আরও বেশী করে হেদায়াত দান করেন। দ্বিতীয়ত, আল্লাহর উপর নির্ভরতা ও তাঁর সামনে আমাদের বিনয়াবনত অবস্থার উপর হেদায়াত প্রাপ্তি নির্ভর করে, এবং আল্লাহর কাছে আরও হেয়াদায়াতের জন্য প্রার্থনাও সেটাই সাক্ষী দেয়। আমরা যদি আল্লাহর কাছে প্রার্থনাই না করি, তবে আমরা কি করে দাবী করতে পারি যে আমরা হেদায়াত প্রাপ্ত হয়েছি? মহানবী (সা:) বলেন: ‘যে ব্যক্তি মহান আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে না, আল্লাহ তার উপর অসন্তুষ্ট হন’ [সুনান ইবনে মাজাহ:৩৮২৭ ই:ফা:]

ইবনে কাইয়্যিম বলেছেন, আমরা আল্লাহর কাছে যে সরল পথ প্রদর্শনের জন্য প্রার্থনা করি তাতে দুইটি বিষয় রয়েছে, ইলম এবং আমল, আবার এই দুটোই বাহ্যিক ও আভ্যন্তরীণ। কোন বান্দার সমস্ত বিষয়ে পরিপূর্ণ জ্ঞান না থাকতে পারে, যেমন কি করা উচিত, কোনটা পরিত্যাগ করা উচিত, কিসে আল্লাহ সন্তুষ্ট হবেন, কিসে অসন্তুষ্ট হবেন। বান্দার অজ্ঞতার পরিমান তার জ্ঞানের চেয়ে অনেক বেশী হতে পারে। কাজেই, আমরা আল্লাহর কাছে যখন পথ প্রদর্শনের বা হেদায়াতের প্রার্থনা করছি, তখন আল্লাহর কাছে আমাদের জ্ঞানের বৃদ্ধির জন্যও প্রার্থনা করছি। আবার অনেক সময়, জ্ঞান থাকা সত্ত্বেও আমরা কিছু আমল করতে পারি আবার অনেক কিছুই করতে পারি না। যেমন আমরা জানি, আমাদের হজ্জ করতে যাওয়া উচিত, কিন্তু আমাদের অনেকেরই সাধ্য থাকে না। আবার, অনেক সময় আমাদের জ্ঞান আর সাধ্য থাকা সত্ত্বেও আমাদের নফসের বা প্রবৃত্তির কারনে অনেক আমল আমরা করতে পারি না। যেমন আমরা কিয়াম-উল-লাইল বা তাহাজ্জুদ নামাজের অপরিসীম ফজীলতের কথা জানি, কিন্তু আলস্যের কারনে অনেকেই এই নামাজ পড়ার উদ্যোগ নিতে বা ঘুম থেকে উঠতে পারি না। আমরা যখন আল্লাহর কাছে হেদায়াত চাই, তখন এই প্রার্থনাও করি যেন আল্লাহ আমাদের অন্তর বা নফসকেও সংশোধন করে দেন।

 আবার, এমনও হতে পারে যে আমাদের জ্ঞান, সাধ্য, সৎ আমল করার সদিচ্ছা সবই আছে, কিন্তু তারপরও হয়তো আমরা সত্যিকার ভাবে আন্তরিক হতে পারছি না। হয়তো আমাদের নিয়ত পুরপুরি খাঁটি নয়। আল্লাহর কাছে হেদায়াত প্রার্থনা করার অর্থ এটাও প্রার্থনা করা যেন তিনি আমাদের আন্তরিক হওয়ার তৌফিক দেন। কারণ আমলে অন্তর উপস্থিত থাকা আমাদের সঠিক পথে অটল থাকতে সাহায্য করে। আল্লাহর কাছে হেদায়াত প্রার্থনা করার অর্থ এটাও প্রার্থনা করা যেন আমরা মহানবী (সাঃ) এর সুন্নাহ পুরোপুরি অনুসরণ করতে পারি, এবং এতে দৃঢ় ও অটল থাকতে পারি।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *